মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
চটগ্রাম বিভাগ, জীবন ধারা, প্রচ্ছদ, ফিচার সন্দ্বীপে সনাতনী সম্প্রদায়ের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

সন্দ্বীপে সনাতনী সম্প্রদায়ের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ


পোস্ট করেছেন: উপ সম্পাদক | প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ৬, ২০১৯ , ৭:৫৯ অপরাহ্ণ | বিভাগ: চটগ্রাম বিভাগ,জীবন ধারা,প্রচ্ছদ,ফিচার


বাদল রায় স্বাধীন
———————–
সন্দ্বীপের সনাতনী সম্প্রদায়ের অতীত, বর্তমান ও ভবিষৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বলতে হয় সন্দ্বীপ যদিও একটি বিচ্ছিন্ন জনপদ হয় তবু এর ভৌগলিক সীমারেখা ডিঙ্গিয়ে সন্দ্বীপ বাংলাদেশের একটি অংশ হওয়ার চেয়ে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বা নিজ নামে বিশ্ব মাঝে পরিচিত হয়েছে তার স্ব-মহিমায়। তার জন্য সবচেয়ে বেশী অবদান এক সময়ের সম্ভ্রান্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে দিতে হবে। এটা এ জন্য বলছি যে। সন্দ্বীপকে প্রথম বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে পরিচিত করেছেন কবি মৎসেন্দ্রনাথ দত্ত বা মীন নাথ।সন্দ্বীপে সর্বপ্রথম পত্রিকা সম্পাদনার মতো গুরু দায়িত্ব হাতে নিয়েছিলেন ডাঃ নিত্যলাল দাস। যার সম্পাদিত পত্রিকা সাপ্তাহিক দ্বীপ বার্তা মুদ্রন যন্ত্রের বন্ধ্যা যুগকে অতিক্রম করে দীর্ঘ বারো বছর চালানোর রেকর্ড বর্তমান প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় ও কেউ ভাঙতে পারেনি।
বাঙ্গালীকে বৃটিশ দাসত্ব থেকে মুক্তি দেওয়ার মতো দুঃসাহসিক স্বপ্ন দেখিয়েছিলো একজন সনাতনী বিপ্লবী লালমোহন সেন। বাঙলা হবে আমাদের রাষ্ট্রভাষা সেটা প্রথম মুখ খুলে বলতে পারার মতো জীবন বাজি রাখা উচ্চারন তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের বৈঠকে বলেছিলো সন্দ্বীপ সন্তান রাজ কুমার চক্রবর্তী।
নাট্যাঙনে সন্দ্বীপ সহ উপ-মহাদেশ পুরোটা চষে বেড়িয়েছিলেন লাল মোহন শীল। যার নাট্যদলের নাম ছিলো লাল মোহন থিয়েটার।সন্দ্বীপে যখন চিকিৎসা সেবার মধ্যে একমাত্র চিকিৎসা শাস্ত্র আয়ুর্বেদ ছাড়া বিকল্প ব্যবস্থা ছিলোনা।
তখনকার চিকিৎসকদের নাম বলতে গেলে একটাও মুসলিম খুঁজে পাবেননা। যাদের নাম আসবে তারা হলো ইদ্র কবিরাজ,অমুল্য কবিরাজ,বটা বাবু,লালমোহন শাস্ত্রী,ভুবন নন্দী প্রকাশ ভন্ড কবিরাজ, ডাঃ সত্যকান্ত মজুমদার, অবনী মোহন মজুমদার, সুধীর রন্জন কবিরাজ,দীনদয়াল কবিরাজ,রমনী কবিরাজ প্রমুখ।
সন্দ্বীপের হাট বাজার গুলোর নাম যদি একটু খেয়াল করি তাহলে দেখবেন বানীর হাট, শিবের হাট,সেনের হাট,ধোপার হাট, চৌধুরী বাজার, পন্ডিতের হাট, বক্তার হাট, শান্তির হাট, শনির হাট, সন্দ্বীপ টাউনকেও বলা হতো বানী বাবুর বাজার। আর প্রায় বেশীর ভাগ হাটের নামকরন করা হয়েছে সনাতনী সম্প্রদায়ের প্রভাব শালী মহলের নামে। নিশ্চয় সে সমস্ত হাট বাজার সৃষ্টিতে তাদের দান অনুদান বা হাট সৃষ্টিতে তাদের প্রচেষ্টা স্মরনীয় ছিলো বলে তাদের নামে নামকরন করা হয়েছে।
শিক্ষক সমাজ এবং ওকালতি পেশায়ও সফলদের নাম বলতে বললে উদাহরন হিসেবে যাদের নাম আসবে তারা আমাদের হিন্দু দাদারাই।
সকল গ্রামে গ্রাম্য শালিস বা বিচার কার্যে একক নিয়নন্ত্রন ছিলো হিন্দু প্রভাব শালীদের। তখনও হিন্দু সম্প্রদায়ের হার তুলনামুলক ভাবে তেমন বেশী ছিলোনা। কিন্তু শিক্ষা, দীক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, রাজনীতি, ব্যবসা, চিকিৎসা, শিক্ষকতা, নাট্যাঙ্গন, আইন পেশা, চাকুরি,প্রশাসনিক বিভিন্ন দপ্তর সব কিছুতে একক আধিপত্য ছিলো হিন্দু সম্প্রদায়ের।
কিন্তু একাত্তরে বিভিন্ন হিন্দু পাড়ায় পাড়ায় আগুন, হত্যা, ধর্ষন, ৯১ সালে বাবরি মসজিম বনাম রাম মন্দিরের তর্কে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট, ২০০১ সালে নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু নির্যাতনে বিশ্ব বিবেককে নাড়া দেওয়া,মৌলবাদের চরম উথ্বান, এছাড়াও বিভিন্ন নির্বাচন পুর্ববর্তী ও পরবর্তী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের সম্ভাবনা আতংক, যুদ্ধাপরাধের বিচারে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করন বা বাদী ও স্বাক্ষীর ভুমিকায় সম্পৃক্তকরন, শত্রু সম্পত্তি বা এনিমি সম্পত্তির ধোয়া তুলে রাজনৈতিক ভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দলের নেতাদের দ্বারা ভুমি দখল এগুলো মানুষকে চরম নিরাপত্তাহীনতার অাতংকে ভোগাচ্ছে।
আবার অাওয়ামী রাজনীতিবিদরা সংখ্যালঘুদের নিশ্চিত ভোট ব্যাংক মনে করে উদাসীনতা দেখানো বা অবহেলা করা এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের পুর্বে তাদের প্রতিপক্ষ মনে করে নির্বাচনী কেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য ভয়ভীতি দেখানো এছাড়াও ক্ষমতার পালা বদলের পর যুদ্ধাপরাধ ও রাজনৈতিক মামলায় বাদী বা স্বাক্ষীর ভুমিকায় থাকার প্রশ্ন তুলে সম্ভাব্য নির্যাতনের সম্ভাবনা অবচেতন মনে হলেও সনাতনী সম্প্রদায়ের মনে আতংকের রেখাপাত করে। তাই ভবিষৎ জীবন যাপনে অনিশ্চয়তাবোধ স্বদেশ প্রেমের বিপরীতে বিদেশ প্রেমের কড়া নাড়ে।
তাইতো কবির সুরে অনেককে বলতে শুনি “ধরা যায়না, ছোঁয়া যায়না, বলা যায়না কথা, রক্ত দিয়ে পেলাম শালার এমন স্বাধীনতা”।স্বাধীনতা পরবর্তী ৪৭ বছরে সন্দ্বীপ হতে বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু অঞ্চল হতে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকরা  মাইগ্রেশন করেছে এটা নির্মম সত্য ও কঠিন বাস্তবতা বা অপ্রিয় সত্যও বলতে পারেন। কিন্ত তা হচ্ছে পুস ফেক্টর, ফুল ফেক্টর নয়। যাকে বলে বাধ্য হয়ে যাওয়া বা বেঁচে থাকার তাগিদে যাওয়া।
উন্নত জীবন যাপনের জন্য মোটেও নয়। কারন অনেকে সেখানে গিয়ে অর্থনৈতিক ভাবে আরো বেশী কষ্টে দিনাতিপাত করছে কিন্তু অনিশ্চিত আতংক থেকে মুক্তি পেয়েছে।আর তার জন্য সকল রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সমান ভাবে দায়ী আওয়ামীলিগরাও।
এখন রাষ্ট্রের প্রয়োজন তাদের সে অনিশ্চিত অাতংক থেকে  মুক্তি প্রদান।আতংকহীন জীবনযাপনের সে নিশ্চয়তা প্রদান রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। প্রয়োজন রাষ্ট্রের প্রতি তাদের বিশ্বাস বাড়ানো।
অন্যায় অত্যাচার,ভুমি দখল, (বিয়ের সময়, বাড়ি তৈরির সময়, বিদেশ থেকে আসার পর, জায়গা বিক্রীর পর) চাঁদাবাজির বিপরীতে নিশ্চিত বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান এবং সেজন্য প্রয়োজন সংখ্যালঘু নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রনালয় গঠন এবং অবাধ ধর্ম চর্চার পরিবেশ তৈরির জন্য উপজেলা পর্যায়ে একটি মডেল মসজিদ স্থাপনের যে পরিকল্পনা গ্রহন করেছে সরকার  সংখ্যাগত তুলনায় তেমনি তাদের জন্য কমপক্ষে জেলা পর্যায়ে একটি মডেল মন্দির স্থাপন করে আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন।
এছাড়াও রাজনৈতিক দল গুলোতে সংখ্যালঘু কোটা করে সেখানে তাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো। আর তাতে তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরার জন্য তাদের প্রতিনিধিত্ব তৈরি হলে সেগুলো নেতাদের কাছে উপস্থাপনের সুযোগ পাবে।
ফলে তাদের প্রতি জোর জুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাৎক্ষনিক এ্যাকশনে যাওয়া যাবে। এখন এমন অনেক ঘটনা ঘটে যেগুলো নেতাদের কর্নকুহরে প্রবেশ করেনা।
বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি যদি তাকাই সেখানে দেখা যাবে সংখ্যালঘুদের অবস্থান প্রতিনিধিত্ব একেবারে জিরো পর্যায়ে। তাহলে এক সময়ে যারা নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ে ছিলো তাদের মাঝে কি নেতৃত্বের অভাব? না তা মোটেও নয়।  সংখ্যালঘুদের যে সমস্ত সংগঠন রয়েছে সেগুলোতে দেখবেন সবাই নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্য বলে সেখানে নেতৃত্বের জায়গা নিয়ে সব সময় একটা সংকট লেগে আছে কারন নেতার পরিমান অনুযায়ী আমরা তাদের ভালো প্লাটফরম এর সুযোগ করে দিতে পারিনা সেটা সন্দ্বীপের সাংসদ, উপজেলা চেয়ারম্যন, ভাইস চেয়ারম্যান, মেয়র সহ সকল ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যরাও অবগত।
তাই রাজনৈতিক দলগুলোতে কিছু প্লাটফরম তৈরি করে পদ পদবীতে অন্তভুক্ত করে দিতে পারলেও সেখানে নেতৃত্বের কাড়াকাড়ি কিছুটা কমে যেতো। এখন পুরো সন্দ্বীপে খুঁজলে আমরা দেখবো শুধু একটি রাজনৈতিক দলে মাত্র ৩/৪ জন সংখ্যালঘু প্রতিনিধি রয়েছে তাও স্বাক্ষী গোপাল হিসেবে যা দলের বৈধতা প্রদানের জন্য প্রয়োজন।তাই তাদের অভাব অভিযোগের বিপরীতে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রয়োজন তাদের বেশী বেশী রাজনীতিতে  সম্পৃতকরন।
এককালে যারা রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে ছিলো আজ সদস্য লেভেলেও তাদের অনুপস্থিতি প্রমান করে তাদের দাবীয়ে রাখার চেষ্টা বা তাদের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা সব রাজনৈতিক দলের । কিন্তু তারা চাইছে রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহন নিশ্চিত করে তাদের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে দেয়া হউক।তারা চাইছে স্বদেশের সংকটময় মুহুর্তেও এই জন্মভুমির মাটিতে যেমন ইচ্ছে চড়ে বেড়ানোর অন্য নাগরিকের মতো সমান স্বাধীনতা এবং চায় দেশ গঠনেও তারা ভুমিকা রাখতে বা উন্নয়ন কর্মকান্ডে অবদান রাখার সুযোগ পেতে। তারা আঁকড়ে ধরে থাকতে চায় জন্মভুমির মাটি ও মানুষকে।চায় মিলে মিশে হিন্দু মুসলিম আত্মীয়ের মতো বসবাস করতে।  কারন স্বাধীনতা পরবর্তী ৪৭ বছর ধরেও বেশীর ভাগ মানুষ অনিশ্চিত আতংক বুকে চেপে রেখেও দেশ ত্যাগ করেনি।
ওপারে এক খন্ড জায়গা থাকার পরও জন্মভুমিতে একজন নাগরিক হিসেবে অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার এ এক কঠিন প্রচেষ্টা বা  তপস্যা বলে আমি মনে করি। আর সে সুযোগ তৈরি করে দিতে না পাড়লে অর্থনৈতিক ভাবে স্বচ্ছল পরিবার গুলো ভবিষৎ অনিশ্চয়তার কথা ভেবে, তাৎক্ষনিক বাধ্য হওয়া পরিস্থিতি মোকাবেলায় যদি একখন্ড জমি ভৌগলিক সীমা রেখার বাইরে ক্রয় করে রাখে,তবে তাদের মনে দেশপ্রেম নেই এমন মিথ্যা অপবাদ দেওয়া তাদের মর্মমুলে রেখাপাত করবে এটা নিশ্চিত।
৭২ এর সংবিধান অনুযায়ী দেশে অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধ তৈরি হউক। আবারও প্রমান হউক আমার দেশ মুটে, মজুর, শ্রমিক, গরীব নিঃস্ব ফকির সহ হিন্দু মুসলিম সকলের সব মানুষের কোন সম্প্রদায়ের নয়।মানবিক গুন ও সাম্প্রদায়িক বৈচিত্রতা হবে আমাদের সম্পদ হানাহানির উপাদান নয়।

Comments

comments

Close