সোমবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
রংপুর বিভাগ ৭ জনের বুকের রক্তের বিনিময়ে আজ ফুলছড়ি হানাদারমুক্ত দিবস

৭ জনের বুকের রক্তের বিনিময়ে আজ ফুলছড়ি হানাদারমুক্ত দিবস


পোস্ট করেছেন: রংপুর বিভাগীয় ব্যুরো চিফ , | প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৪, ২০১৯ , ১২:৪৬ অপরাহ্ণ | বিভাগ: রংপুর বিভাগ


ছাদেকুল ইসলাম রুবেল,গাইবান্ধা প্রতিনিধি : ৪ ডিসেম্বর গাইবান্ধার ফুলছড়ি হানাদারমুক্ত দিবস। এদিন ফুলছড়িকে মুক্ত করতে গিয়ে ৫ বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ২ বেসামরিক ব্যক্তি বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে শাহাদত বরণ করেছিলেন।

৭১’ এর মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের উষালগ্নে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনী বাংলায় “পোড়ামাটি নীতি” বাস্তবায়নের জন্য জালাও-পোড়াওসহ ধ্বংসযজ্ঞ চরম সীমায় উপনিত হয়েছিল তখন ফুলছড়ির মাটি ও মানুষকে রক্ষার জন্য ১১ নং সেক্টরের অধীন মুক্তিবাহিনীর একটি বিশাল দল ফুলছড়ি থানা সদরের অদুরে ব্রহ্মপুত্র নদের পুর্ব তীর মুক্তাঞ্চল গলনার চরে অবস্থান গ্রহন করে।

মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার গৌতম চন্দ্র মোদকের নেতৃত্বে ফুলছড়ি সেনাশিবির আক্রমণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। পরিকল্পনা মোতাবেক ৩ ডিসেম্বর গভীর রাতে মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা কমান্ডার সামছুল আলম, কমান্ডার নাজিম উদ্দিন, আ: জলিল তোতা, এনামুল হকের পরিচালনায় মুক্তিযোদ্ধারা ৪ দলে বিভক্ত হয়ে ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিয়ে ফুলছড়ি থানা সদরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান গ্রহন করে।

৪ ডিসেম্বরের প্রত্যুষে গেরিলা কমান্ডার সামছুল আলমের দলটি সর্বপ্রথম ফুলছড়ি থানা (পুলিশ ষ্টেশন) আক্রমণ করে। উপর্যুপরি গ্রেনেড হামলা ও ব্যাপক গোলাগুলি শুরু হলে অপর ৩টি দলের মুক্তিযোদ্ধারা একসাথে চারিদিক থেকে গগণবিদায়ী গোলা বর্ষণের মাধ্যমে পাক সেনাশিবিরের দিকে এগুতে থাকে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফুলছড়ি থানা পুলিশের সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পন করে। মুক্তিযোদ্ধারা থানার অস্ত্রাগারের অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিজেদের আয়ত্বে নিয়ে নেয়।

এদিকে চর্তুমুখী আক্রমণে পাকসেনা শিবিরের সেনারা প্রমাদ গুনতে থাকে। পরিনাম আঁচ করতে পেরে পাকসেনারা শিবির ত্যাগ করে দক্ষিণে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের আড়ালে অবস্থান নেয়। শিবির ত্যাগ করার সময় বাউশি গ্রামের মফেল আকন্দের পুত্র মোজাম্মেল আকন্দ এক পাক সেনার পিছু ধাওয়া করলে ওই পাকসেনা মোজাম্মেলকে গুলি করে হত্যা করে। পাকসেনারা বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধে আশ্রয় নিলেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে তারা পিছু হটে এবং গোবিন্দি গ্রামের খোলা প্রান্তর দিয়ে উর্দ্ধশ্বাসে বোনারপাড়ার দিকে দৌঁড়ে পালাতে থাকে। পাকসেনাদের এহেন পরিনতি দেখে গ্রামবাসীরাও পাকসেনাদের ধাওয়া করে। এ সময় গোবিন্দি গ্রামের সংস্কৃতি কর্মী মফিজল হক এক পাকসেনাকে জাপটে ধরলে পাকসেনারা বেয়নেটের খোঁচায় মফিজলকে হত্যা করে।

সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এ যুদ্ধাবস্থা চলাকালীন এক পর্যায়ে মিত্রবাহিনীর বোমারু বিমান পাখিমারাস্থ তিস্তামুখঘাটে উপর্যুপরি বোমা বর্ষণ চালাতে থাকে। সন্ধ্যা পর্যন্ত এ বোমা বর্ষণের ফলে তিস্তামুখঘাটের ভাসমান সেনাশিবিরের সদস্যরা প্রানভয়ে তিস্তামুখঘাট ত্যাগ করে বিচ্ছিন্নভাবে যত্রতত্র পালাতে থাকে।

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের আঁধার ঘনিয়ে আসে। এ সময় মূলদল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া পাকসেনাদের একটি দল বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের উপর দিয়ে উত্তর দিকে আসার সময় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এনামুলের দলের মুখোমুখি হলে উভয় দলের মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। লোমহর্ষক এ সম্মুখযুদ্ধে ২২ পাকসেনা নিহত হয় এবং ৫ বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদত বরণ করেন। শাহাদত বরণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ হলেন আফজাল হোসেন, কবেজ আলী, যাহেদুর রহমান বাদল, ওসমান গণী এবং আব্দুল সোবহান। পরদিন ৫ ডিসেম্বর সকালে এ ৫ বীরের মরদেহ গরুর গাড়িযোগে সাঘাটা থানার সগুনা ইউনিয়নের খামার ধনারুহা স্কুল প্রাঙ্গঁনের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এ ৫ বীর শহীদের সম্মানার্থে সগুনা ইউনিয়নের নাম পরিবর্তন করে মুক্তিনগর ইউনিয়ান রাখা হয়।

Comments

comments

Close