শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
ফিচার, শিক্ষাঙ্গন স্তব্দ শাটলের বছর পার

স্তব্দ শাটলের বছর পার


পোস্ট করেছেন: বার্তা বিভাগ | প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ১৬, ২০২১ , ১১:৪২ অপরাহ্ণ | বিভাগ: ফিচার,শিক্ষাঙ্গন


নুর নবী রবিন

ভেতরে কোনো কোলাহল নেই। নেই হৈচৈ। তাড়াহুড়ো করে দৌঁড়ে আসছে না কোনো শিক্ষার্থী। কাগজ-কলম আর ব্যাগ দিয়ে বন্ধুর জন্য সিট ধরছে না সদ্য ফাস্ট ইয়ারে ভর্তি হওয়া কোনো নবীণ। দ্বিতীয়বর্ষে পড়ুয়া প্রেমিকা ল্যাবক্লাস শেষে ৫টার শাটলে ফিরবে বলে শহর থেকে ৩টার ট্রেনে সিট ধরে ক্যাম্পাসে যাচ্ছে না কোনো চতুর্থবর্ষের প্রেমিক। খাতা থেকে দু’টা পাতা ছিঁড়ে ধূলোর আস্তর মুছে বসতে দেখা যাচ্ছে না কোনো হান্নান-মান্নান আর লামিয়া-সামিয়াকে।
প্রতিটি বগির শেষদিকে বসে গলা ছেড়ে কেউ গায়ছে না ওয়ারফেজ, ব্ল্যাক, অর্থহীন, আর শিরোনামহীনের গান। এমন পিতনপতন এক নিরব নিস্তব্ধতায় চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শাটল ট্রেন।
এভাবে স্তব্ধ পড়ে থেকে বছর পার করল শাটল ট্রেন।
দেশের অন্যসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেয় শাটল ট্রেন। শহর হতে ২২ কিলোমিটার দূরের পাহাড় ঘেরা ক্যাম্পাসে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান বাহন এটি। এই ট্রেনকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের ঘটে প্রাণের মেলবন্ধন। এখানে গান, আড্ডা, পড়াশোনা এবং প্রেম সবকিছু নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বাসে থাকে চবির শিক্ষার্থীরা। তাই এটিই শিক্ষার্থীর ভ্রাম্যমাণ ক্যাস্পাস। শাটলে গায়তে গায়তে সৃষ্টি হয়ছে দেশসেরা নামীদামী অনেকে সঙ্গীত ব্র্যান্ড। শাটলের প্রেম নিয়ে সিনেমা বানিয়েই তো জাতীয় পুরস্কার জিতে নিল চবির প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রদীপ ঘোষ।
প্রায় ২১’শ একরের বিশাল ক্যাম্পাসের সর্বদখিণের ফরেস্ট্রি ইনস্টিটিউটের বন্ধুটির সাথে সর্বউত্তরের আইন অথবা শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের বন্ধুদের দেখা হয়ে যায় এই শাটলেই।
কিন্তু গত বছরের মার্চ মাসে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি ঘোষণার সাথেসাথে চলাচল বন্ধ হয়ে যায় শাটল ট্রেনও। ২১ সালে এসে ক্যাম্পাসে পরীক্ষা নেওয়া শুরু হলেও চালু হয়নি ট্রেন৷ শিক্ষার্থীদের আটকে থাকা পরীক্ষাগুলো শেষ করতে বাস-টেম্পোর নানারকম ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়েছিল তখন। এ নিয়ে অনেকে দেখিয়েছিল ভীষণ ক্ষোভ। কেউ কেউ আশা প্রকাশ করে বলেছিল, আমাদের ভোগান্তি কমাতে নিশ্চয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিছুদিনের মধ্যে শাটল ট্রেন চালুু করার ব্যবস্থা করবেন।
কিন্তু তাদের সেই ভরসার ভারা ভাতে ছাঁই পড়ল আরেক ঘোষণায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয় ২৪শে মে’র আগে হল খুলবে না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে কার্যতভাবে বন্ধ হয়ে যায় পরীক্ষা৷ বন্ধই থেকে যায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেন।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থেকে ঝিমুতে থাকা শাটল জোড়ার পাশ দিয়ে হেঁটে টিউশন যান আইন বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান৷ ১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী বললেন, প্রতিদিন যখন এগুলোর পাশ দিয়ে যাই, মনের ভেতরে এক ধরনের হাহাকার কাজ করে। কেমন যেন দুঃখবোধ হয়। কী যেন ফেলে যাচ্ছি মনে হয়৷ আপন কিছু ছেড়ে যাচ্ছি—এমন লাগে। ভাবি, যদি সব আগের মতো হয়ে যেতো। সকালে উঠে দৌঁড়ে সিট ধরতে পারতাম। গান গাইতে পারতাম ফের।
তবে আশারবাণী হলো, ক্যাম্পাস খুললে আরেকটি নতুন ট্রেন দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। এইটুকুন ভেবে একটু সুখবোধ করতে পারে চবির শিক্ষার্থীরা। আর বর্ষব্যাপি ছুটি কাটানোর শুভেচ্ছা জানাতে পারে শাটল ট্রেন আর বন্ধুদের।

Comments

comments

Close